আমাদের
সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। এটি একটি ভুল
ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালা সপ্তম আসমানের উপর অবস্থিত আরশে আযীমের উপরে
সমুন্নত রয়েছেন। তবে তাঁর ক্ষমতা, রাজত্ব,
পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে
বিরাজমান। এ বক্তব্যের স্বপক্ষে কয়েকটি কুরআনের আয়াত,
সহীহ হাদিস এবং সম্মানিত চার ইমামের উক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ
তোমাদের
প্রতিপালক আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। দিনকে
তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন, তারা একে অন্যকে
দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে এবং সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তাঁরই আজ্ঞাবহ। জেনে রেখ, সৃষ্টি
তাঁর, হুকুমও (চলবে) তাঁর, বরকতময়
আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক। [সূরা আল-আ'রাফ/৭, আয়াতঃ ৫৪]
নিশ্চয়ই
তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী আর পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি
করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করেন। তাঁর
অনুমতি প্রাপ্তি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই হলেন আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। কাজেই তোমরা
তাঁরই ‘ইবাদাত কর, তোমরা কি
উপদেশ গ্রহণ করবে না? [সূরা ইউনুস/১০, আয়াতঃ ১০]
আল্লাহ, যিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ উঁচু
করেছেন যা তোমরা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়োজিত করেছেন।
এর প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন। আয়াতসমূহ
বিস্তারিত বর্ণনা করেন, যাতে তোমাদের রবের সাক্ষাতের
ব্যাপারে তোমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হতে পার। [সুরাআর-রাদ/১৩, আয়াতঃ ২]
আল্লাহ
যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এ দু’এর মাঝে যা কিছু আছে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন- অতঃপর তিনি ‘আরশে সমুন্নত হন। তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য কোন অভিভাবক নেই, সুপারিশকারীও নেই। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? [সূরাঃআস-সাজদাহ/৩২, আয়াতঃ ৪]
তিনি
আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা
যমীনে প্রবেশ করে, আর যা তাত্থেকে বের হয়, আর যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়, আর যা তাতে উঠে
যায়, তোমরা যেখানেই থাক তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যে কাজই কর না কেন, আল্লাহ তা দেখেন। [সূরা
আল-হাদীদ/৫৭, আয়াতঃ ৪]
তিনি
তোমাদের জন্য যমীনকে (তোমাদের ইচ্ছার) অধীন করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা তার বুকের উপর দিয়ে
চলাচল কর, আর আল্লাহর দেয়া রিযক হতে আহার কর, পুনরায় জীবিত হয়ে তাঁর কাছেই যেতে হবে। তোমরা কি তোমাদেরকে নিরাপদ মনে
করে নিয়েছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদেরকে যমীনে
বিধ্বস্ত করে দিবেন না যখন তা হঠাৎ থর থর করে কাঁপতে থাকবে? কিংবা তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, যিনি
আকাশে আছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী ঝড়ো হাওয়া পাঠাবেন না? যাতে তোমরা জানতে পারবে যে, কেমন (ভয়ানক) ছিল
আমার সতর্কবাণী। [সূরা আল-মুলক/৬৭, আয়াতঃ ১৫-১৭]
আবূল
ইয়ামান (রহঃ) ... আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ফিরিশতাগণ এক দলের পেছনের আর একদল আগমন
করেন। একদল ফিরিশতা রাতে আসেন আর একদল ফিরিশতা দিনে আগমন করেন। তাঁরা ফজর ও আসর
সালাতে একত্রিত হয়ে থাকেন। তারপর যারা তোমাদের কাছে রাত্রিযাপন করছিল তারা আল্লাহর
কাছে উর্ধ্বে চলে যান। তখন তিনি তাদেরকে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।
অথচ তিনি তাদের চেয়ে এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবহিত আছেন। তখন তিনি বলেন, তোমরা আমার বান্দাহকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছো? উত্তরে
তারা বলেন, আমরা তাদের সালাতের অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। আর
আমরা তাদের কাছে সালাত (নামায/নামাজ)-এর অবস্থাতেই পৌঁছেছিলাম। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৪৯/সৃষ্টির সূচনা, হাদিস নম্বরঃ ২৯৯৬]
মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সালাত (নামায/নামাজ) আদায়
করেছিলাম। ইত্তবসরে আমাদের মধ্যে একজন হাঁচি দিল। আমি ইয়ারহামুকাল্লহ বললাম। তখন
লোকেরা আমার দিকে আড় চোখে দেখতে লাগল। আমি বললাম আমার
মায়ের পূত্র বিয়োগ হোক। তোমরা আমার প্রতি তাকাচ্ছ কেন? তখন
তারা তাদের উরুর উপর হাত চাপড়াতে লাগল। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে, তখন আমি চুপ হয়ে
গেলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত শেষ করলেন, আমার মাতা-পিতা তাঁর জন্য কুরবান হোক! আমি তার মত এত সুন্দর করে শিক্ষা
দিতে পূর্বেও কাউকে দেখিনি, তাঁরপরেও কাউকে দেখিনি।
আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে ধমক দিলেন না, মারলেন না,
গালিও দিলেন না। বরং বললেন, সালাতে কথা
কথাবার্তা বলা ঠিক নয়। বরং তা হচ্ছে- তাসবীহ, তাকবীর ও
কুরআন পাঠের জন্য।
আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! জাহিলি যুগ
বিদুরিত হল বেশী দিন হয়নি, এইতো ইসলাম এসেছে আমাদের কেউ
কেউ তো গনকদের নিকট আসা যাওয়া করে। তিনি বললেন, তুমি
তাদের কাছে যেওনা। আমি পূনরায় বললাম, আমাদের কেউ কেউ তো
শুভ ও অশূভ লক্ষণের অনুকরণ করে। তিনি বললেন, এটি তাদের
মনগড়া বিষয়। এটি যেন তাদেরকে (কোন ভাল কাজ করতে) বাধা না দেয়। আমি বললাম, আমাদের মধ্যে কিছু লোক রেখা অঙ্কন করে, (ভাগ্য
নির্নয় করে) তিনি বললেন, একজন নবী রেখা অঙ্কন করতেন। যার
রেখা সেই নাবীর রেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হবে তারটা ঠিক হবে।
(বর্ণনাকারী মুঅেবিয়া বলেন) আমার একটি
দাসী ছিল। সে উহুদ ও জাওয়ানিয়ার দিকে আমার ছাগল চরাত। একদিন আমি সেখানে উপস্থিত
হয়ে দেখি, একটি একটি বাঘ এসে একটি ছাগল নিয়ে গেল। যেহেতু
আমিও মানুষ, সেহেতু অন্যান্য মানুষের মত আমারও রাগ এসে
গেল। আমি তাকে একটি চড় বসিয়ে দিলাম। তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর নিকট এলাম। তিনি আমার এই কাজকে অত্যন্ত অপছন্দ করলেন। আমি বললাম,
ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি কি তাকে আযাদ করে দিব? তিনি বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে এসো আমি তাকে
তার নিকট নিয়ে এলাম। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ
কোথায় আছেন? সে বলল, আকাশে। তিনি
বললেন, আমি কে? সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসুল। তখন তিনি বললেন, ওকে আযাদ
করে দাও। কেননা ও মু'মিনা। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ),
অধ্যায়ঃ ৫/মসজিদ ও সালাতের স্থান, হাদিস নম্বরঃ ১০৮২]
বারা ইবনু আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জনৈক আনসারির
জানাজায় বের হলাম, আমরা তার কবরে পৌঁছলাম, তখনো কবর খোঁড়া হয়নি, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবসলেন আমরা তার চারপাশে বসলাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে, তার হাতে
একটি লাকড়ি ছিল তিনি মাটি খুড়তে ছিলেন, অতঃপর মাথা উঠিয়ে
বললেন: “তোমরা আল্লাহর নিকট কবরের আযাব থেকে পানাহ চাও,
দুইবার অথবা তিনবার (বললেন)”। অতঃপর বললেন: “নিশ্চয় মুমিন বান্দা যখন দুনিয়া
প্রস্থান ও আখেরাতে পা রাখার সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয় তার নিকট আসমান থেকে সাদা
চেহারার ফেরেশতাগণ অবতরণ করেন, যেন তাদের চেহারা সূর্য।
তাদের সাথে জান্নাতের কাফন ও জান্নাতের সুগন্ধি থাকে, অবশেষে
তারা তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মালাকুল মউত আলাইহিস সালাম এসে তার
মাথার নিকট বসেন, তিনি বলেন: হে পবিত্র রুহ তুমি আল্লাহর
মাগফেরাত ও সন্তুষ্টির প্রতি বের হও”। তিনি বললেন: “ফলে রুহ বের হয় যেমন মটকা/কলসি
থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। তিনি তা গ্রহণ করেন, যখন গ্রহণ করেন
চোখের পলক পরিমাণ তিনি নিজ হাতে না রেখে তৎক্ষণাৎ তা সঙ্গে নিয়ে আসা কাফন ও সুগন্ধির
মধ্যে রাখেন, তার থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘ্রাণ বের হয় যা
দুনিয়াতে পাওয়া যায়”। তিনি বললেন: “অতঃপর তাকে নিয়ে তারা ওপরে ওঠে,
তারা যখনই অতিক্রম করে তাকে সহ ফেরেশতাদের কোন দলের কাছ দিয়ে
তখনই তারা বলে, এ পবিত্র রুহ কে? তারা বলে: অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে সুন্দর
নামে ডাকে যে নামে দুনিয়াতে তাকে ডাকা হত, তাকে নিয়ে তারা
দুনিয়ার আসমানে পৌঁছে, তার জন্য তারা আসমানের দরজা খোলার
অনুরোধ করেন, তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হয়, তাকে প্রত্যেক আসমানের নিকটবর্তীরা পরবর্তী আসমানে অভ্যর্থনা জানিয়ে
পৌঁছে দেয়, এভাবে তাকে সপ্তম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়,
অতঃপর আল্লাহ বলেন: আমার বান্দার দফতর ইল্লিয়্যিনে লিখ এবং তাকে
জমিনে ফিরিয়ে দাও, কারণ আমি তা (মাটি) থেকে তাদেরকে
সৃষ্টি করেছি, সেখানে তাদেরকে ফেরৎ দেব এবং সেখান থেকেই
তাদেরকে পুনরায় উঠাব”। তিনি বলেন: “অতঃপর তার রুহ তার শরীরে ফিরিয়ে
দেয়া হয়, এরপর তার নিকট দু’জন
ফেরেশতা আসবে, তারা তাকে বসাবে অতঃপর বলবে: তোমার রব কে?
সে বলবে: আল্লাহ। অতঃপর তারা বলবে: তোমার দ্বীন কি? সে বলবে: আমার দ্বীন ইসলাম। অতঃপর বলবে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের
মাঝে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলবে: তিনি রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর তারা বলবে: কিভাবে জানলে? সে বলবে: আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তাতে ঈমান
এনেছি ও তা সত্য জ্ঞান করেছি। অতঃপর এক ঘোষণাকারী আসমানে ঘোষণা দিবে: আমার বান্দা
সত্য বলেছে, অতএব তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও,
তাকে জান্নাতের পোশাক পরিধান করাও এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে
একটি দরজা খুলে দাও। তিনি বলেন: ফলে তার কাছে জান্নাতের সুঘ্রাণ ও সুগন্ধি আসবে,
তার জন্য তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত তার কবর প্রশস্ত করে দেয়া
হবে। তিনি বলেন: তার নিকট সুদর্শন চেহারা, সুন্দর পোশাক ও
সুঘ্রাণসহ এক ব্যক্তি আসবে, অতঃপর বলবে: সুসংবাদ গ্রহণ কর
যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে তার, এটা তোমার সেদিন যার ওয়াদা
করা হত। সে তাকে বলবে: তুমি কে, তোমার এমন চেহারা যে শুধু
কল্যাণই নিয়ে আসে? সে বলবে: আমি তোমার নেক আমল। সে বলবে:
হে আমার রব, কিয়ামত কায়েম করুন, যেন
আমি আমার পরিবার ও সম্পদের কাছে ফিরে যেতে পারি”। তিনি বলেন: “আর কাফের বান্দা যখন দুনিয়া
থেকে প্রস্থান ও আখেরাতে যাত্রার সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়, তার
নিকট আসমান থেকে কালো চেহারার ফেরেশতারা অবতরণ করে, তাদের
সাথে থাকে ‘মুসুহ’ (মোটা-পুরু
কাপড়), অতঃপর তারা তার নিকট বসে তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত,
অতঃপর মালাকুল মউত আসেন ও তার মাথার কাছে বসেন। অতঃপর বলেন: হে
খবিস নফস, আল্লাহর গোস্বা ও গজবের জন্য বের হও। তিনি
বলেন: ফলে সে তার শরীরে ছড়িয়ে যায়, অতঃপর সে তাকে টেনে
বের করে যেমন ভেজা উল থেকে (লোহার) সিক বের করা হয় [কারণ
ভেজা উল সাধারণত: লোহার সাথে লেগে থাকে। তখন তা ছাড়িয়ে নেয়া কষ্টকর হয়। - সম্পাদক],
অতঃপর সে তা গ্রহণ করে, আর যখন সে তা
গ্রহণ করে চোখের পলকের মুহূর্ত হাতে না রেখে ফেরেশতারা তা ঐ ‘মোটা-পুরু কাপড়ে রাখে, তার থেকে মৃত দেহের যত
কঠিন দুর্গন্ধ দুনিয়াতে হতে পারে সে রকমের দুর্গন্ধ বের হয়। অতঃপর তাকে নিয়ে তারা
ওপরে উঠে, তাকেসহ তারা যখনই ফেরেশতাদের কোন দলের পাশ দিয়ে
অতিক্রম করে তখনই তারা বলে, এ খবিস রুহ কে? তারা বলে: অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে নিকৃষ্ট
নাম ধরে যার মাধ্যমে তাকে দুনিয়াতে ডাকা হত, এভাবে তাকে
নিয়ে দুনিয়ার আসমানে যাওয়া হয়, তার জন্য দরজা খুলতে বলা
হয়, কিন্তু তার জন্য দরজা খোলা হবে না”। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামতিলাওয়াত করেন:
﴿لَا تُفَتَّحُ لَهُمۡ
أَبۡوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلۡجَمَلُ فِي
سَمِّ ٱلۡخِيَاطِۚ ٤٠﴾ [الاعراف: ٤٠]
“তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে
না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট
সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে”। [সূরা আল-আরাফ, আয়াতঃ৪০] অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: তার আমলনামা জমিনে
সর্বনিম্নে সিজ্জিনে লিখ, অতঃপর তার রুহ সজোরে নিক্ষেপ
করা হয়। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
﴿وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ
ٱلسَّمَآءِ فَتَخۡطَفُهُ ٱلطَّيۡرُ أَوۡ تَهۡوِي بِهِ ٱلرِّيحُ فِي مَكَانٖ
سَحِيقٖ ٣١﴾ [الحج : ٣١]
“আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা
বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল”। [সূরা হজ্জ, আয়াতঃ৩১] তার রুহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর তার নিকট দু’জন ফেরেশতা আসে ও তাকে বসায়, তারা তাকে
জিজ্ঞাসা করে: তোমার রব কে? সে বলে: হা হা আমি জানি না।
অতঃপর তারা বলে: তোমার দ্বীন কি? সে বলে: হা হা আমি জানি
না। অতঃপর তারা বলে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলে: হা হা আমি জানি না, অতঃপর আসমান থেকে
এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে যে, সে মিথ্যা বলেছে, তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও, তার
দরজা জাহান্নামের দিকে খুলে দাও, ফলে তার নিকট তার তাপ ও
বিষ আসবে এবং তার ওপর তার কবর সংকীর্ণ করা হবে যে, তার
পাঁজরের হাড় একটির মধ্যে অপরটি ঢুকে যাবে। অতঃপর তার নিকট বীভৎস চেহারা, খারাপ পোশাক ও দুর্গন্ধসহ এক ব্যক্তি আসবে, সে
তাকে বলবে: তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা তোমাকে দুঃখ দিবে,
এ হচ্ছে তোমার সে দিন যার ওয়াদা করা হত। সে বলবে: তুমি কে,
তোমার এমন চেহারা যে কেবল অনিষ্টই নিয়ে আসে? সে বলবে: আমি তোমার খবিস আমল। সে বলবে: হে রব কিয়ামত কায়েম কর না”। [সহীহ হাদিসে কুদসি, অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ, হাদিস
নাম্বারঃ ৬৬]
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবূ যার (রাঃ)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমার ঘরের ছাদ খুলে দেয়া হল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। তারপর
জিবরীল (আঃ) এসে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। আর তা যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন। এরপর
হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি সোনার পাত্র নিয়ে আসলেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিয়ে
বন্ধ করে দিলেন। তারপর হাত ধরে আমাকে দুনিয়ার আসমানের দিকে নিয়ে চললেন। যখন
দুনিয়ার আসমানে পৌঁছালাম, তখন জিবরীল (আঃ) আসমানের
রক্ষককে বললেনঃ দরযা খোল। তিনি বললেনঃ কে? উত্তর দিলেনঃ
আমি জিবরীল, আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ আপনার সঙ্গে আর কেউ আছে
কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আমার
সঙ্গে মুহাম্মদ। তিনি আবার বললেনঃ তাঁকে কি আহবান করা হয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ হাঁ।
তারপর আসমান খোলা হলে আমরা প্রথম আসমানে উঠলাম। সেখানে দেখলাম, এক লোক বসে আছেন এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি তাঁর ডান পাশে রয়েছে এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি বাম পাশেও রয়েছে। যখন তিনি ডান দিকে তাকাচ্ছেন, হাসছেন আর যখন তিনি বাম দিকে তাকাচ্ছেন, কাঁদছেন। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ, হে পুণ্যবান নাবী! হে নেক সন্তান! আমি জিবরীল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলামঃ ইনি কে? তিনি বললেনঃ ইনি আদম (আঃ)। আর তাঁর ডানে ও বায়ে তাঁর সন্তানদের রুহ। ডান দিকের লোকেরা জান্নাতী আর বা দিকের লোকেরা জাহান্নামী। এজন্য তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন আর বাঁ দিকে তাকালে কাঁদেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় আকাশে উঠলেন। সেখানে উঠে রক্ষক কে বললেনঃ দরযা খোল। তখন রক্ষক প্রথম আসমানের রক্ষকের অনুরুপ প্রশ্ন করলেন। তারপর দরযা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেনঃ এরপর আবূ যার বলেনঃ তিনি (নাবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসমানসমূহে আদম (আঃ), ঈদরীস (আঃ), মূসা (আঃ), ‘ঈসা (আঃ), ও ইবরাহীম (আঃ)-কে পেলেন। আবূ যার (রাঃ) তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট ভাবে
বলেন নি। কেবল এতটুকু বলেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম (আঃ)-কে প্রথম আসমানে এবং ইবরাহীম (আঃ)-কে ষষ্ট আসমানে
পেয়েছেন। আনাস (রাঃ) বলেনঃ যখন জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে
ইদরীস (আঃ) এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঈদরীস (আঃ)
বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নাবী ও নেক ভাই! আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈদরীস (আঃ)। তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে
যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পূণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি বললাম ইনি কে?
জিবরীল (আঃ) বললেনঃ মূসা (আঃ)। তারপর আমি ঈসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে
যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম
ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈসা (আঃ)।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নাবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন যে, ইবনু হাযম আমাকে খবর দিয়েছেন ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী (রাঃ) উভয়ে বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল, আমি এমন এক সমতল স্থানে উপনীত হলাম, যেখান থেকে কলমের লেখার শব্দ শুনতে পেলাম। ইবনু হাযম (রহঃ) ও আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আল্লাহ তা’আলা আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করে দিলেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তনকালে যখন মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ কি ফরয করেছেন? আমি বললামঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নাবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন যে, ইবনু হাযম আমাকে খবর দিয়েছেন ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী (রাঃ) উভয়ে বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল, আমি এমন এক সমতল স্থানে উপনীত হলাম, যেখান থেকে কলমের লেখার শব্দ শুনতে পেলাম। ইবনু হাযম (রহঃ) ও আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আল্লাহ তা’আলা আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করে দিলেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তনকালে যখন মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ কি ফরয করেছেন? আমি বললামঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না।
আমি ফিরে গেলাম। আল্লাহ পাক কিছু অংশ কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ) এর কাছে আবার গেলাম আর বললামঃ কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। আমি ফিরে গেলাম। তখন আরো কিছু অংশ কমিয়ে দেওয়া হল। আবার মূসা (আঃ) এর কাছে গেলাম, এবারো তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। তখন আমি আবার গেলাম, তখন আল্লাহ বললেনঃ এই পাঁচই (সওয়াবের দিক দিয়ে) পঞ্চাশ (গণ্য হবে)। আমার কথার কোন পরিবর্তন নেই। আমি আবার মূসা (আঃ) এর কাছে আসলে তিনি আমাকে আবারো বলললেনঃ আপনার রবের কাছে আবার যান। আমি বললামঃ আবার আমার রবের কাছে যেতে আমি লজ্জাবোধ করছি। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আর তখন তা বিভিন্ন রঙে ঢাকা ছিল, যার তাৎপর্য আমার জানা ছিল না। তারপর আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হল। আমি দেখলাম তাতে মুক্তার হার রয়েছে আর তাঁর মাটি কস্তুরি। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৮/সালাত, হাদিস নম্বরঃ ৩৪২]
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আমার কাছে বুরাক আনা হল। বুরাক গাধা
থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদুর দৃষ্টি যায়, এক এক পদক্ষেপে সে ততাদূর চলে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল
মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে
রজ্জুতে বাধতেন, আমি সে রজ্জুতে আমার বাহনটিও বাধলাম।
তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু-রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে বের হলাম।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি শরারের পাত্র এবং
একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আলাইহিস
সালাম) আমাকে বললেন, আপনি ফিরতকেই গ্রহণ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত
পৌছে দার খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে
পাঠান হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ,
ডেকে পাঠানো হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দরজা খূলে দেয়া হল।
সেখানে আমি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাৎ পাই তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন এবং
আমার মঙ্গলের জন্য দুআা করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে ঊর্ধ্বলোকে
নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলেন ও দ্বার খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি
উত্তরে বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, তাকে কি আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের
জন্য দার খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া
(আলাইহিমুস সালাম) দুই খালাত ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন,
আমার জন্য কল্যাণের দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে
নিয়েঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা
হল, কে? তিনি বললেনঃ
জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি
বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে
কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের
জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইউসূফ (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। সমুদয়
সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাঁকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার
কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে চতুর্থ
আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? বললেন,
জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন,
হ্যাঁ তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে
দেওয়া হলো। সেখানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা
বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুঃআ করলেন। আল্লাহ তা’আলা
তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا “এবং আমি
তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়—” (৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে পঞ্চম
আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খূলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি
বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান
হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া হল। সেখানে হারুন (আলাইহিস সালাম) এর
সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ
আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল।
বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি
বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে
কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের
জন্য দ্বার খূলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি
আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সপ্তম আসমানের
দ্বারপ্রাস্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললোন, জিবরীল।
বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি
বললেন, মুহাম্মাদ বলা হল, আপনাকে
কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের
জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম।
তিনি বায়তুল মা’মুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। বায়তুল মামুরে
প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন, যারা আর সেখানে পূনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল
মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হস্থিনীর কানের মত আর ফলগুলো বড় বড়
মটকার মত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে বৃক্ষটিকে যখন
আল্লাহর নির্দেশে যা আবৃত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা
আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তায়াআলা আমার উপর যা অহী
করার তা অহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। এরপর আমি
মূসা(আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয
করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন,
আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন
করুন। কেননা আপনার উম্মাত এ নির্দেশ পাননে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা
করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মাতের জন্য এ
হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর
কাছে ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে।
তিনি বললেন, আপনার উম্মাত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং
আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়াহ
করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও, দিন ও রাতের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত
নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাত দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে
(পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যাক্তি কোন নেক কাজের ইচ্ছা
করল এবং তা কাজে রুপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি
সাওয়াব লিখব; অ্যর তা কাজে রুপায়িত করলে তার জন্য লিখব
দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের অভিপ্রায় করল, অথচ তা কাজে পরিণত করল না, তার জন্য কোন গুনাহ
লেখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লেখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম।
তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং
আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
এ বিযয় নিয়ে বারবার আমি আমার রবের কাছে আসা-যাওয়া করেছি, এখন
পূনরায় যেতে লজ্জা হচ্ছে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১/কিতাবুল ঈমান, হাদিস
নম্বরঃ ৩০৮]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের প্রতি যে ঈমান আনল, সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করল
ও রমযানের সিয়াম পালন করল সে আল্লাহর পথে জিহাদ করুক কিংবা স্বীয় জন্মভূমিতে বসে
থাকুক, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া আল্লাহর দায়িত্ব
হয়ে যায়। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি
লোকদের এ সুসংবাদ পৌঁছে দিব না? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে মুজাহিদদের জন্য আল্লাহ তা'আলা
জান্নাতে একশটি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু’টি
স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দুরত্বের ন্যায়। তোমরা আল্লাহর কাছে চাইলে ফেরদাউস
চাইবে। কেননা এটাই হল সবচাইতে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ-ও বলেছেন, এর উপরে রয়েছে আরশে রহমান। আর সেখান থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত
হচ্ছে। মুহাম্মদ ইবনু ফুলাইহ্ (রহঃ) তাঁর পিতার সূত্রে (নিঃসন্দেহে) বলেন, এর উপরে রয়েছে আরশে রহমান। [সহীহ বুখারী
(ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৪৮/জিহাদ, হাদিস
নম্বরঃ ২৫৯৮]
আল্লাহ তা'আলা সবকিছু সম্পর্কে জানেন। এই বিষয়ে কুরআনে
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
আর যখন আমার বান্দাগণ
তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই,
যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার
প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। [সূরা আল-বাকারা/২, আয়াতঃ ১৮৬]
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হও। তোমরা সাহস ও
ক্ষমতাহারা হয়ে যাবে যদি নিজেদের মধ্যে বিবাদ কর। তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহ
ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। [সূরা আল-আনফাল/৮, আয়াতঃ ৭]
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরই সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন
করে এবং যারা সৎ কর্মপরায়ণ। [সূরা আন-নাহাল/১৬, আয়াতঃ ১২৮]
আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি, আর তার প্রবৃত্তি তাকে (নিত্য নতুন)
কী কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আমি তার গলার শিরা থেকেও নিকটবর্তী। [সূরা
কাফ/৫০, আয়াতঃ ১৬]
তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে নিশ্চয় আল্লাহ তা জানেন? তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না,
আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন
হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি
তো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর
কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব
বিষয়ে সম্যক অবগত। [সূরা আল-মুজাদালা/৫৮, আয়াতঃ ৭]
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গেলাম। তিনি বলেন, তখন তিনি
কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে দু’ব্যক্তির মতবিরোধের আওয়ায
শুনতে পান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে আসলেন,
তখন তাঁর চেহারায় ক্রোধের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। তিনি বললেনঃ
তোমাদের পূর্ববতীরা আল্লাহর কিতাবে মতবিরোধ করার দরুণ ধ্বংস হয়েছে। [সহীহ
মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৪৯/ইলম, হাদিস নম্বরঃ ৬৫৩৪]
ইমামগণের মতামত -
ইমাম আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ যে ব্যক্তি বলবে
আল্লাহ আসমানে আছেন নাকি যমীনে আছেন আমি তা জানি না, সে কুফরী করবে। অনুরূপভাবে যে বলবে আল্লাহ আরশে আছেন কিন্তু তাঁর আরশ
আসমানে নাকি যমীনে আমি তা জানি না, সেও কুফরী করবে। [আল
ফিকহুল আবসাত, পৃষ্ঠা ৪৬ ।। মাজমুউ ফাতওয়া ইবনু
তাইমিয়্যাহ, ৫/৪৮ পৃষ্ঠা]
ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ বলেছেনঃ আল্লাহ হচ্ছেন আসমানে
আর তাঁর জ্ঞান সব জায়গায় বিরাজমান। [মাসায়িলি ইমাম আহমাদ, পৃষ্ঠা ২৬৩ ।। ইবনু আব্দিল বার
বর্ণনা করেছেন আত তামহিদ, ৭/১৩৮]
ইমাম শাফেঈ বলেছেনঃ ঐ সুন্নাহ বা রীতির ব্যাপারে কথা হলো
যে সুন্নাহ বা রীতির উপর আমি আছি এবং আমার সাথীদেরকে দেখেছি তার উপর। আর আহলে
হাদিসদেরকে দেখেছি যাদের কাছ থেকে আমি ইলম গ্রহণ করেছি যেমন সুফইয়ান, মালিক এবং অন্যান্যরা তারা ঐ বিধানের
উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আর তা হল এ স্বীকৃতি দেয়াঃ আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন
ইলাহ নেই, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। এবং আল্লাহ তায়ালা আসমানে আরশের উপর রয়েছেন। তিনি যেভাবে
ইচ্ছা তার সৃষ্ট জীবের নিকটবর্তী হন এবং আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই দুনিয়ার আসমানে
নামেন। [ইজতিমাউল জুউশিল ইসলামী, পৃষ্ঠা ১৬৫ ।। ইসবাতুল
উলু, পৃষ্ঠা ১২৪]
ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তায়ালা যেভাবে
তিনি চান সেভাবেই তিনি আরশে রয়েছেন। আমরা এর প্রতি বিশ্বাস আনবো এর কোন সীমা বা
সিফাত বর্ণনা করা ব্যতীত। কেননা আরশে সমাসীন হওয়া আল্লাহর একটি সিফাত। আর আল্লাহর
সিফাত ঐ ভাবেই বর্ণনা করতে হবে যেভাবে তিনি নিজের জন্য বর্ণনা করেছেন। যেখানে কোন
চোখের পৌছা সম্ভব নয়। [আদ দূরউ তায়ারুযিল আকলি ওয়ান নাকলি, ২/৩১]
No comments:
Post a Comment